Tranding

স্বাধীনতা আন্দোলনে শহীদ ক্ষুদিরামের পাশাপাশি শহীদ শের আলী এবং শহীদ ভগত সিংয়ের পাশাপাশি শহীদ আশফাক উল্লাহ খানের বর্ণময় উপস্থিতি দেশবাসীর কাছে স্মরণীয় অবদান : ইবনে শফিকুর রহমান---

স্বাধীনতা আন্দোলনে শহীদ ক্ষুদিরামের পাশাপাশি শহীদ শের আলী এবং শহীদ ভগত সিংয়ের পাশাপাশি শহীদ আশফাক উল্লাহ খানের বর্ণময় উপস্থিতি দেশবাসীর কাছে স্মরণীয় অবদান

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস রচিত হয়েছে অসংখ্য বীর শহীদের রক্তে। এই মহাকাব্যের প্রতিটি অধ্যায়ে রয়েছে ত্যাগ, সাহস, দেশপ্রেম এবং আত্মোৎসর্গের অমলিন দৃষ্টান্ত। সাধারণত আমরা ক্ষুদিরাম বসু বা ভগত সিংয়ের মতো বিপ্লবীদের নামই বেশি স্মরণ করি, কিন্তু তাঁদের পাশাপাশি শহীদ শের আলী আফ্রিদি ও আশফাক উল্লাহ খান ছিলেন সেই যুগের অনন্য দেশপ্রেমিক, যাঁদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগ ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রামকে করেছে আরও সমৃদ্ধ ও বর্ণময়।

**শহীদ ক্ষুদিরাম বসু তরুণ বিপ্লবের প্রতীক : 

১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট, মাত্র ১৮ বছর বয়সে হাসিমুখে ফাঁসির মঞ্চে উঠেছিলেন ক্ষুদিরাম বসু। তাঁর অপরাধ— ব্রিটিশ অত্যাচারী বিচারপতি কিংসফোর্ডের গাড়িতে বোমা নিক্ষেপের চেষ্টা। মুজফ্ফরপুরে ভুলক্রমে অন্য দু’জন মারা গেলেও ক্ষুদিরাম নিজের কাজের দায় স্বীকার করেন এবং মৃত্যুকে বরণ করেন দেশের জন্য।

তাঁর এই আত্মোৎসর্গে ভারতবর্ষে এক তরুণ বিপ্লবী জোয়ার সৃষ্টি হয়। স্কুল-কলেজের ছাত্ররা তাঁর নাম জপতে শুরু করে, বিপ্লবীরা সাহস পায় মৃত্যুভয় ভুলে স্বাধীনতার লড়াই চালিয়ে যেতে। ক্ষুদিরাম প্রমাণ করেছিলেন যে স্বাধীনতার জন্য বয়স নয়, প্রয়োজন অদম্য দেশপ্রেম। তাঁর “বন্দেমাতরম” ধ্বনি আজও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে প্রতিধ্বনিত হয়।

** শহীদ শের আলী আফ্রিদি প্রথম ফাঁসিকাঠে ঝোলা বিপ্লবী :

ক্ষুদিরামের বহু বছর আগে, ১৮৭২ সালে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আত্মোৎসর্গ করেছিলেন এক অজানা বীর— শের আলী আফ্রিদি। ব্রিটিশরা তাঁকে পরবর্তী সময়ে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা শহীদদের অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

শের আলী ছিলেন আফগান সীমান্তবর্তী এলাকার একজন সৈনিক, যিনি ১৮৫৭ সালের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। পরে তাঁকে আন্দামান সেলুলার জেলে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি ১৮৭২ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড মেয়োকে হত্যা করেন। এই হত্যাকাণ্ড ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক প্রতিবাদ— একজন উপনিবেশিক শাসকের বিরুদ্ধে এক বন্দির সাহসী চ্যালেঞ্জ।

১৮৭২ সালের ১১ মার্চ তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। যদিও ব্রিটিশ সরকার তাঁকে “অপরাধী” বলেছিল, কিন্তু ভারতের ইতিহাস তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে একজন শহীদ হিসেবে, যিনি দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার ডাক দিয়েছিলেন তখনই, যখন স্বাধীনতার ভাবনাটিই ছিল এক বিপজ্জনক স্বপ্ন।

শহীদ ভগত সিং — সাহস ও আদর্শের প্রতীক : 

স্বাধীনতার আন্দোলনের ইতিহাসে ভগত সিং নামটি যেন এক অগ্নিশিখা। ১৯০৭ সালে পাঞ্জাবের ভঙ্গায় জন্ম নেওয়া এই তরুণ বিপ্লবী ভারতীয় যুবসমাজের চেতনার প্রতীক হয়ে ওঠেন।

লালা লাজপত রায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ১৯২৮ সালে ভগত সিং, রাজগুরু ও সুখদেব ব্রিটিশ অফিসার স্যান্ডার্সকে হত্যা করেন। পরে ১৯২৯ সালে দিল্লির কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তাঁরা গ্রেপ্তার হন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি— “ইঙ্কিলাব জিন্দাবাদ”— আজও স্বাধীনতার অমোঘ স্লোগান।

১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ লাহোর সেন্ট্রাল জেলে ফাঁসি দেওয়া হয় ভগত সিং, রাজগুরু ও সুখদেবকে। মৃত্যুর আগে তিনি বলেছিলেন, “তোমরা আমাকে মারতে পারো, কিন্তু আমার চিন্তা ও স্বপ্নকে হত্যা করতে পারবে না।” সেই চিন্তা আজও ভারতীয় তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে প্রেরণার জ্বালানি।

শহীদ আশফাক উল্লাহ খান ভ্রাতৃত্ব ও ত্যাগের প্রতীক :

ভগত সিংয়ের মতোই একই যুগে আরেক উজ্জ্বল নাম— আশফাক উল্লাহ খান, যিনি ছিলেন হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের প্রতীক। ১৯০০ সালে উত্তরপ্রদেশের শাহজাহানপুরে জন্ম নেওয়া আশফাক উল্লাহ ছোটবেলা থেকেই বিপ্লবী চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হন। তিনি ছিলেন “হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন” (HRA)-এর অন্যতম সংগঠক।

১৯২৫ সালের কাকোরি ট্রেন ডাকাতি কাণ্ডে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ডাকাতি ছিল ব্রিটিশ সরকার থেকে টাকা ছিনিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের তহবিল সংগ্রহের পরিকল্পনা। রামপ্রসাদ বিসমিল, রাজেন্দ্র লাহিড়ী, রোশন সিং প্রমুখের সঙ্গে আশফাক উল্লাহও এই অভিযানে অংশ নেন।

গ্রেপ্তারের পর তিনি আদালতে বলেন—

"আমার ধর্ম ইসলাম, কিন্তু আমার আত্মবিশ্বাস হলো দেশপ্রেম। আমি ভারতকে স্বাধীন দেখতে চাই।”

১৯২৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর, লখনৌ জেলে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। মৃত্যুর আগে তিনি নামাজ পড়ে বলেছিলেন— “আল্লাহ, আমার দেশকে স্বাধীনতা দাও।”

তাঁর মৃত্যুর পর দেশজুড়ে শোকের সঙ্গে গর্বও ছড়িয়ে পড়ে— কারণ তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে ধর্ম, জাতি বা বর্ণ নয়, দেশপ্রেমই প্রকৃত ধর্ম 

** শের আলী, ক্ষুদিরাম, ভগত সিং ও আশফাক উল্লাহ— চারজনই ভিন্ন ভিন্ন সময়ের, ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের, কিন্তু তাঁদের লক্ষ্য একটাই— ভারতের স্বাধীনতা। তাঁরা প্রমাণ করেছেন যে স্বাধীনতার সংগ্রাম কেবল এক জাতি বা এক ধর্মের লড়াই নয়, এটি গোটা জাতির আত্মমর্যাদা রক্ষার যুদ্ধ।

এই চার শহীদের জীবন আমাদের শেখায়—

স্বাধীনতার জন্য জাতি ও ধর্মের বিভাজন নয়, ঐক্যই প্রকৃত শক্তি।

তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সাহস, সততা ও আত্মত্যাগের বীজ বপন করতে হবে।

রাষ্ট্রপ্রেম মানে শাসকের ভয় নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের লড়াই।

স্বাধীনতার এই দীর্ঘ সংগ্রামে শহীদ ক্ষুদিরাম, শের আলী, ভগত সিং ও আশফাক উল্লাহ খানের অবদান এক অমর অধ্যায়। তাঁদের রক্তে লেখা ইতিহাস আজও আমাদের জাতীয় চেতনাকে জাগিয়ে রাখে।

ভারতের স্বাধীনতা শুধুমাত্র এক রাজনৈতিক অর্জন নয়, এটি মানবিক ঐক্য ও সহাবস্থানের এক ঐতিহাসিক প্রমাণ। তাই এই শহীদদের স্মরণ করা মানে শুধু অতীতের শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য অনুপ্রেরণার শপথ।

আজকের প্রজন্মের কর্তব্য হলো তাঁদের ত্যাগের আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখা— যাতে আগামী দিনের ভারত হয়ে ওঠে সত্যিকার অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ, ঐক্যবদ্ধ ও ন্যায়নিষ্ঠ।

শহীদদের রক্তে লেখা এই বার্তা আজও অনন্তকাল ধ্বনিত—

“দেশের আগে কিছু নয়, একতার চেয়ে বড় কিছু নয়।

Trusted source for latest breaking news, headlines, and updates from around the world.

© Your Bango Darpan News. All Rights Reserved.