ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের দুর্দশা জানাতে ট্রাম্পকে চিঠি পাঠানোর ভাবনা
ইসরায়েলে বসবাসকারী আরব নাগরিকদের (ফিলিস্তিনি ৪৮) নেতৃত্ব মহল দেশটিতে ক্রমবর্ধমান অপরাধ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সরকারের উদাসীনতার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরতে নতুন কৌশল ভাবছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু তাদের লেখা চিঠি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোর পর, সেই চিঠি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পাঠানোর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নেতৃত্ব পর্যায়ের একটি সূত্র জানায়, নেতানিয়াহু ইচ্ছাকৃতভাবেই আরব নাগরিকদের অভিযোগ উপেক্ষা করছেন। তাদের দাবি, আরব সমাজে প্রতিদিন যে সহিংসতা ও খুনের ঘটনা ঘটছে, সরকার তা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না এবং অপরাধ দমনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না।
সম্প্রতি এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। উত্তরাঞ্চলের সাখনিনে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন এক সমাবেশে, অন্যদিকে তেল আবিবে আয়োজিত বিক্ষোভে যোগ দেন প্রায় ৪৫ হাজার। এছাড়া গালিলি অঞ্চল থেকে শুরু করে জেরুজালেমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত একটি দীর্ঘ পদযাত্রাও হয়।
গত রবিবার ওই পদযাত্রা শেষে আরব নাগরিকদের শীর্ষ দুই প্রতিনিধি—উচ্চ পর্যবেক্ষণ কমিটির প্রধান এবং আরব স্থানীয় প্রশাসন প্রধানদের কমিটির সভাপতি—নেতানিয়াহুর দপ্তরে গিয়ে একটি লিখিত আবেদন জমা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে নিরাপত্তারক্ষীরা তাদের প্রবেশে বাধা দেন। বাধ্য হয়ে তারা সাংবাদিকদের সামনে চিঠির বক্তব্য পড়ে শোনান।
এরপর সোমবার, তেল আবিবের একটি আদালতে নেতানিয়াহু উপস্থিত হলে বিক্ষোভকারীরা আবারও তার কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা দল ভিন্ন পথ ব্যবহার করে তাদের এড়িয়ে যায়। এর পরই নেতৃবৃন্দের মধ্যে ধারণা তৈরি হয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আনা যেতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তেল আবিবে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে চিঠিটি জমা দিয়ে তা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হতে পারে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে আরব সমাজে অপরাধজনিত সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ছিল ২৫২ জন—যা নজিরবিহীন। একই বছরে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান ১৪ জন আরব নাগরিক। গবেষণায় দেখা গেছে, আহতের সংখ্যা নিহতদের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। ২০২৬ সালের শুরু থেকেই এই প্রবণতা আরও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
আরব নাগরিকদের অভিযোগ, অপরাধী চক্রগুলো কার্যত “রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্রে” পরিণত হয়েছে। নিয়মিত গোলাগুলির শব্দে শিশুদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে, বহু পরিবার নিরাপত্তাহীনতার কারণে ঘরবন্দি জীবন যাপন করছে। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক চাঁদা আদায়, ব্ল্যাক মার্কেট ঋণ ও উচ্চ সুদের কারণে বহু মানুষ তাদের সম্পদ হারাতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে কয়েক বিলিয়ন শেকেলে পৌঁছেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, এই অপরাধের প্রভাব সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে—আইনজীবী, শিক্ষক, স্কুলপ্রধান, সাংবাদিক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এমনকি ব্যাংক কর্মকর্তারাও হুমকি ও চাপের মুখে পড়ছেন।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারকে ১০ দফা দাবি জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—অপরাধ দমনে বাধ্যতামূলক সরকারি সিদ্ধান্ত, নির্দিষ্ট বাজেট ও সময়সূচিসহ সমন্বিত পরিকল্পনা, অপরাধী চক্র ভাঙতে কঠোর অভিযান, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, আর্থিক অপরাধ ও চাঁদাবাজি দমন, মাদক ব্যবসা বন্ধ, কারাগারে ও মুক্তির পর পুনর্বাসন কর্মসূচি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের উন্নয়ন এবং আরব স্থানীয় প্রশাসনগুলোর জন্য বিশেষ বরাদ্দ।
আরব নাগরিকদের নেতৃত্ব আশা করছে, আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হলে ইসরায়েল সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।