পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নতুন পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের নরম প্রতিক্রিয়া, দুই রাষ্ট্র সমাধান নিয়ে প্রশ্ন
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ওয়াশিংটন সফরের ঠিক আগে পশ্চিম তীর নিয়ে তার সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার একাধিক সিদ্ধান্তের ফলে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি নাগরিকদের জমি কেনা সহজতর হবে এবং অসলো চুক্তি অনুযায়ী ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে থাকা কিছু এলাকায় ইসরায়েলি আইন প্রয়োগের পরিধি বাড়বে বলে জানা গেছে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনও পশ্চিম তীর সংযুক্তিকরণের বিরোধী এবং অঞ্চলটির স্থিতিশীলতাকেই ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও শান্তির পূর্বশর্ত হিসেবে দেখেন। তবে এ অবস্থানের সঙ্গে কোনও কড়া কূটনৈতিক বা নীতিগত পদক্ষেপ ঘোষণা না হওয়ায় পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, ওয়াশিংটনের আপত্তি আপাতত সীমিত পর্যায়েই রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়; বরং পশ্চিম তীরে ধাপে ধাপে বাস্তবতা পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ। সরাসরি সংযুক্তিকরণের ঘোষণা না দিয়ে প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামোয় পরিবর্তন এনে নতুন পরিস্থিতি তৈরি করা—একে অনেকে “ধাপে ধাপে সংযুক্তিকরণ” হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। এতে আন্তর্জাতিক অস্বস্তি এড়িয়েও মাটিতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা সম্ভব হয়।
ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া নিয়ে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বা প্রকাশ্য কড়া অবস্থানের বদলে সীমিত প্রতিক্রিয়া দেওয়াকে কেউ কেউ দুই দিক সামাল দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন—একদিকে আরব ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আশ্বস্ত করা, অন্যদিকে নেতানিয়াহু সরকারের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না জড়ানো। তবে কেবল ভাষাগত আপত্তি, বাস্তব কোনও চাপ বা শর্ত ছাড়া, নীতিগত পরিবর্তন আনা কঠিন—এমন মতও রয়েছে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ডানপন্থী ও বসতি সম্প্রসারণপন্থী গোষ্ঠীর সমর্থন ধরে রাখতে সরকার যে সক্রিয়—এই সিদ্ধান্ত তা স্পষ্ট করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
পশ্চিম তীরকে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড হিসেবে ধরা হয়। ফলে সেখানে প্রশাসনিক ও আইনি ভারসাম্যে পরিবর্তন দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এসব পদক্ষেপে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাস্তব ভিত্তি সংকুচিত হতে পারে।
এদিকে আরব ও মুসলিম দেশগুলোর পাশাপাশি জাতিসংঘের বিভিন্ন মহল থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের মতে, পশ্চিম তীরের স্থিতাবস্থা পরিবর্তনের যে কোনও পদক্ষেপ আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, পশ্চিম তীরের ‘স্থিতিশীলতা’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ এখন আলোচনার কেন্দ্রে। এটি কি কেবল স্বল্পমেয়াদি নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টা, নাকি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের অংশ—তা স্পষ্ট নয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ইঙ্গিত দিচ্ছে, মাটির বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে, আর কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া তার তুলনায় অনেক ধীর।